জীবনের ছোটো খাটো চিট চ্যাট




চ্যাট জিপিটি। এ যুগের বিস্ময়। এক আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, যা মানুষের মতোই গান, কবিতা, গরুর রচনা থেকে শুরু করে কঠিন কঠিন সব লেখালেখির কাজ চোখের নিমিষেই করে দিচ্ছে। এমন কি ভার্চুয়াল কোম্পানিওন হিসেবেও নাকি বেশ ভালো কাজ করে। বন্ধু বান্ধবীর মতো মন খুলে আলাপ করতে পারে।

আমার অবশ্য প্রথম চ্যাট জিপিটির নামটা শুনেই সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পরেছিলো। যখন আই -আর-সি তে চ্যাট করতাম তখন আমার নিজে ব্যবহার করা নিক নাম গুলোর মধ্যে একটা ফেভরিট নিক ছিলো জিপিটি। এই নিকের শানে নুযুল কি সেটা একটু পরেই বলছি। তার আগে তখনকার আলমটা কেমন ছিলো সেটা একটু বলে নেয়া দরকার।

সে যুগে আমাদের পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য্য ছিল ইন্টারনেট। বাংলাদেশে যখন ডায়াল আপ এর মাধ্যমে ইন্টারনেট দেয়া মাত্র শুরু হলো, তখন আমরা কেবল ভার্সিটিতে পড়ি। মান্ধাত্বার আমলের পুরোনো ল্যান্ড ফোন লাইনের মাধ্যমে মডেম দিয়ে কম্পিউটারে বিস্মের সব খবরা খবর মুহূর্তেই(সেই আমলের দেড় দুই মিনিট) মনিটরে চলে আসছে, ঠিক যেন বিস্বাসী হতো না। বিপুল তো রীতিমতো বলতো এইসব চালাকি। দেখ টি-এন-টি অফিসেই বইসা কেও একজন সব বানায় বানায় লেইখ্যা পাঠাইতেসে। হুদাহুডি পয়সা নষ্ট। যেহেতু ফোন আর নেটের বিল তখনও বাবার পকেট থেকেই যাচ্ছে, আমরা ওর কথায় কান না দিয়ে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যেতাম।

সে সময় মোবাইল ফোন তো অনেক দূরের কথা, ল্যান্ড ফোনই হরে দরে সবার বাসায় ছিলো না। তাই রাব্বির রামপুরার বাসাটাই ছিলো আমাদের একমাত্র ভরসা। বেচারার দোষ হলো, ওর ফোন লাইন, মডেম, কম্পিউটার, আলাদা রুম সবই আছে। আর খালাম্মা খালুও বেশি মাইন্ড করতেন বলে মনে হয়নি কখনো। আন্টি তো গেলেই রীতিমতো সব মজার মিজার খাবার রুমে পাঠিয়ে দিতেন। সো আমরা প্রায়ই সব দল বেঁধে রাতের বেলায় রাব্বির বাসায় হামলা চালাতাম। রাতে, কারণ ওই সময় ফোনের বিলটা কম আসে। আর তাছাড়া দিনের বেলায় ফোন লাইন তো বিজি রাখা যাবে না। তাই মাঝ রাতে রাব্বির রুমে ফোনের জ্যাকটা ফোন থেকে খুলে মডেমে লাগিয়ে কম্পিউটারে কানেক্ট বাটনটা চাপালেই মডেমটা বেশ কিছুক্ষন ধরে টিটি টাটা টোটো ডিংডং ডিংডং ঘরররররর গান শোনাতো আর আমরা অধীর আগ্রহে মনিটরের ডিকে তাকিয়ে থাকতাম ফলাফল দেখার জন্যে। আর সাক্সেসফুলি কানেক্টেড মেসেজটা দেখার সাথে সাথেই সব ঝাঁপিয়ে পরতাম আই-আর-সি তে। পালা করে বিস্মের ওপর প্রান্তের সব অজানা অচেনা লোকেদের সাথে কথোপকথন চালাতে।

এরপর যখন ব্রডব্যান্ডের লাইনগুলো একে একে সব বাসায় বাসায় ঢুকে পড়লো, তখন আর রাব্বিকে জ্বালানোর দরকার পরেনি। সবাই যে যার বাসায় নিজের রুমে বসেই চ্যাট করতে পারছে। আর ততদিনে আই-আর-সি তে বিডি-চ্যাট চ্যানেলটাও বেশ জমে উঠেছে। দুনিয়ার ওপর প্রান্তে আর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যত বাঙালীরাই সব একত্রে এক চ্যাট রুমে বসে আড্ডা জমায়। এমনকি কিছু কিছু মেয়েরাও ততদিনে রাত জাগা শুরু করে দিয়েছে। আর আমরা, যাদের মেয়েদের সাথে সামনা সামনি আলাপ করতে গেলে জিব্বায় গিট্টু লেগে যেত, তাদের জন্য তো সেটা ছিলো একটা স্বর্ণালী যুগ। বন্দুরা সব সালামের হোটেলের দশটা সাড়ে দশটা পর্যন্ত চা বিড়ির আড্ডা শেষে, যে যার বাসায় গিয়ে রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে বিডি-চ্যাটে বোসতাম আবার আড্ডা দিতে।

তখন বিডি চ্যাটের নিক নামটা বেশ ইন্টারেন্টিং হওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ন ছিলো। ওটাই কনভার্সেশন স্টার্টার আর ওটার উপরেই নির্ভর করতো কত বেশি মানুষ তোমাকে নক করবে তা। আর তাই সবাই এস-ও-এস, পাগলা হাওয়া, এ লোনলি ক্যান্ডেল টাইপের যাবতীয় সব দৃষ্টি আকর্ষণীয় নিক ব্যবহার  করতে চেষ্টা করতো। নিক বিভিন্ন গোত্র ও প্রজাতির হলেও সবার ধান্দাই কিন্তু ছিলো এক। অপোজিট সেক্সের সাথে চ্যাট করা। তাই পছন্দসই কোনো নিক বেছে কারওকে নক করে প্রথম ডায়লগটাই হতো - এ-এস-এল? মানে - তোমার এজ, সেক্স আর লোকেশন কি? মেইনলি সময় নষ্ট না করে মেয়ে না ছেলের সাথে কথা হতে যাচ্ছে সেটা আগেই জেনে নেয়া। এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ওপাশ থেকে উত্তর আসতো - সরি ব্রাদার, মেল হেয়ার বাট গুড লাক এনিওয়ে। এপাশ থেকেও দ্রুত -সেম টু ইউ ব্রাদার বলে পিএম উইন্ডো ক্লোজ করে নেক্সট টার্গেটকে নক করো। আর জুৎ মতো কাওকে না পাওয়া পর্যন্ত এই একই প্রসেসের রিপিট চলতো।

তো বিডি চ্যাটে ঢুকে যখন আমি দেখতাম আমার মোস্ট ফেভরিট "সাইকো হলিডে" নিকটা সুমন অলরেডি মেরে দিয়ে মহা সুখে রীতিমতো জাকিয়ে বসেছে, তখন কি আর করা, বেশীর ভাগ সময়ই  আমার তৃতীয় ফেভরিট নিক - জিপিটি টাই ইউস করতাম। কারণ সেকেন্ড ফেভরিট, রূহ-আফজাটা রমজান মাসেই বেশি জমে।

সো তৃতীয়টা নিকটা নিয়ে চ্যাটে ঢোকার পর যখন কেও নক দিয়ে জিজ্ঞেস করতো - জিপিটি মানে কি? জেনারেল পারপাস ট্রান্সফরমার?

তখন উত্তর দিতাম - না, গাজী প্লাষ্টিক ট্যাংক। 

অনেকেই অবাক হয়ে প্রশ্ন করতো - এই অদ্ভুত নিকের কারণ টা কি? ট্যাংকের ব্যবসা আছে নাকি তোমার?

আমি বলতাম - না তা নেই। তবে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতায় এমন কি গায়ের রঙের সাথেও বেশ আছে তো আমার, তাই।

আর সেটা শোনারপরেও কেও যদি এমন ফাজিল টাইপ প্রশ্ন করতো - তা বুঝলাম কিন্তু ঠিক করে বোলোতো তোমার পানিতে এতো ময়লা কেনো?

তখন বুঝতাম এখানে ভালোই জমবে। তাই পাল্টা জবাব দিতাম - তো বাথরুমের কলে মুখ লাগিয়ে পানি খেলে তো ময়লা লাগবেই! পানি ভালো করে ফুটিয়ে ছেঁকে ঠান্ডা করে তারপর খেতে হয়।

- কি আমি পানি খেতে জানিনা! আমি বাথররমের কল থেকে পানি খাই! আম্মুকে ডাক দিবো?

- না না এত রাতে শুধু শুধু খালাম্মাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার দরকার নাই। উনি ঘুমাক। তুমি বরং আইসক্রিম খাবা কিনা সেইটা বলো।

- খাবো খাবো খাবো

- তাহলে ইমেইল এড্ড্রেসটা দাও। আমি ইমেইলে আইসক্রিম সেন্ড করে দিচ্ছি।

আর ঐটা হলো ফেজ টু। বিডি চ্যাট থেকে ইমেল নিয়ে এম-এস-এন মেসেঞ্জারের ফ্রেইন্ড বানানো। আর মেসেন্জারেও যদি বেশ কছুদিন ভালো জমে তাহলে ফেজ থ্রী। টেলিফোন নম্বরটা চাওয়া।

তো মিম ছিলো সুমনের ওরকমই এক ফেজ থ্রী ফ্রেন্ড। আর সুমনের সুবাদেই মিমের সাথে আমার অলরেডি বেশ কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। সুমন অবশ্য মিমকে তার অন্য ডাক নামে, নিম্মি বলেই ডাকতো। সুমনের বক্তব্য অনুযায়ী যুক্ত্যাক্ষর থাকলে নাকি মেয়েদের নামটা আরো বেশি কিউট লাগে! যাহোক, তো একবার সুমন ফেজ ফোরে ওঠার জন্যে মিম ওরফে নিম্মির সাথে একটা ডেট ঠিক করলো।  কিন্তু সুমন একা যাবার সাহস পাচ্ছে না। তাই আমাকেও যেতে হবে ওর সাথে। ঠিক হলো ঢাকা সিটি কলেজের গেটের কাছেই যে আইসক্রিম পার্লারটা ছিলো সেখানে আগামী কাল সকাল দশটায় দেখা হবে। অন্তত্য রাত আড়াইটা পর্যন্ত সে কথাই ছিলো। কিন্তু ভোর চারটার দিকে সুমন মন পাল্টে ফেললো। বললো অনেক রাত জাগা হয়ে গেছে রে। ওতো সকালে ঘুম থেকে ওঠা সম্ভব না। বাদ দে। আমি খুব একটা অবাক হলাম না। সুমনের অর্ধেক এগিয়ে শেষে ওই "বাদ দে" অভ্যাসটা সবারই জানা। আমিও বরং হাফ ছেড়ে বেঁচে আরও ঘন্টা খানেক কম্পিউটারে গেম টেম খেলে নিশ্চিন্তে মনের সুখে ঘুম  দিলাম।   

ঘুম ভাঙলো সকালে মেজো বোনের ডাকে। চোখ খুলতেই - দেখ কোন মেয়ে জানি তোরে ফোন দিসে বলে হ্যান্ড সেটটা বিছানায় শোয়া অবস্থাই আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো। যাবার আগে অবশ্য ঘুরে আরেকবার আমার দিকে তাকালো। আমি চেহারা দেখেই বুঝলাম মনে মনে বলছে - ওরে আবার কোন বেআক্কেলে ফোন দিতে গেসে! 

যাহোক আমি কোনো মতে চোখ ডলতে ডলতে হান্ডসেটটা কানে লাগিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে মিমের হুঙ্কার শুনতে পেলাম -  কি ব্যাপার! আপনাদের না সকাল দশটায় আসার কথা!

তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারলাম শালার সুমন মিম কে প্রোগ্রাম ক্যান্সেলের মেসেজটা দেয় নাই। কিন্তু এখন আমি কি বলবো বুঝে উঠতে না পেরে গাধার মতো প্রশ্ন করে বসলাম - কেনো? এখন কয়টা বাজে?
  
- কয়টা বাজে মানে? এগারোটা! আরেকজন তো ফোন ধরতেসে না। আপনিও ঘুমাচ্ছিলেন নাকি?

ঝাড়ির ঠেলায় কিছু না ভেবেই বললাম - না না আমি তো রওনা ডিসি।

- রওনা দিলে আপনি বাসার ফোন ধরলেন কিভাবে? ফাজলামো করেন? 

- না মানে জাস্ট রওনা দিবো আর কি। আধা ঘন্টার মতো লাগবে। ওয়েট করবা?

ওপাশ থেকে খটাস করে ফোন রাখার শব্দ শুনলাম। 

হান্ডসেটটা পাশে রেখে কি করবো ভাবতে ভাবতে চোখটা বুজে এসেছে এমন সময় আবারো ফোন আসলো। ধরতেই ওপাশ থেকে বললো -আপনি কি কোনো মানুষ নাকি?

- কোনো কি করলাম আবার!

- আধা ঘন্টার কথা বলে আবারো এক ঘন্টা পার করে দিলেন! আর আপনি এখনোও ঘুমাচ্ছেন! আর কখনো ফোন দিবেন না আমাকে। বলে আবারো খটাস করে ফোন দেখে দিলো। আমি দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সত্যি বারোটা বাজে। নাহ এখন উঠতেই হবে। অফিস যাওয়া দরকার। 

আমি তখন আইপনিক্সে কাজ করি ওয়েব ডিসাইনার হিসেবে। ইন্টারনেটের অগ্রগতির কারণে তখন বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে শুরু করে আকিজ বিড়ি সবাই ওয়েব সাইট বানানোতে মহা আগ্রহী। আর সে সময়েই বাংলাদেশে ওয়েব ডিসাইনারের হাহাকার চলছিলো। তাই বাশ বনের শিয়াল রাজা আমি মনের সুখে যখন খুশি তখন অফিসে যাই। আপার মেনেজমেন্টও কোনো প্রকার ঘাটাঘাটি না করে ফুল স্যালারিই দিয়ে যাচ্ছে। আসলে দিন শেষে ক্লায়েন্টের ওয়েবসাইট রেডি পেলেই তারা খুশী। কিন্তু আমার কলিগ প্রোগ্রামমারদের কাছে ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগেনি। অভিয়াসলি লাগার কথাও না। রেজা তো একদিন বলেই বসলো - তোমার চেহারাটা দেখলেই আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়। আমরা সকাল আটটায় শুরু করে ভাগ্য ভালো থাকলে রাত আটটায় অফিস থেকে বের হই। আর তুমি হেলতে দুলতে দুপুর একটা দুইটায় এসে আবার বিকাল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই ক্যাবলা মার্কা হাসি দিয়ে মনের সুখে অফিস থেকে বের হয়ে যাও। আমরা ঠিক করসি সবাই মাইল একদিন তোমারে গণধোলাই দিবো। 

রেজা ঠাট্টার করলেও আমাদের তখনকার প্রজেক্ট ম্যানেজার মাহমুদ ভাই সুযোগে পেলে যে আসলেই আমাকে গণ ধোলাই দিতেন সেটা আমি ভালোই টের পেতাম। উনার দোষ নেই অবশ্য। কারণ দিন শেষে  উনাকেই ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলতে হয় তাই উনার মাথায়ই বেশী ব্যাথা। অনেক অনেক দিন পর যখন, আমি আর মাহমুদ ভাই দুজনেই আইপনিক্স ছেড়ে দিয়েছি তখন একবার নাখালপাড়ার কাছেই এক খোলা মাঠে বসে দুজনে আড্ডা দেয়ার সময় উনাকে জিগ্যেস করেছিলাম -  আচ্ছা মাহমুদ ভাই, এখন তো আমি আপনি কেউই আইপনিক্সে নাই। এখন সত্যি করে বলেন তো আইপনিক্সে থাকতে আপনি আমাকে মনে মনে কি কি গালি দিতেন?  

শুনে মাহমুদ ভাইয়ের চোখগুলো জ্বলজ্বল করে উঠেছিলো। উনি রীতিমতো নড়েচড়ে বসে বলা শুরু করলেন - ভাই আমি শুরুই করতাম (এখানে লেখা যাবে না)র পোলা দিয়ে। দুনিয়ার এমন কোনো গালি নাই আমি আপনারে দেই নাই। আমারে দোষ দিতে পারবেন না, এই যে আমার কপালের উপরে এখন যে এতো বড়ো একটা টাক, এইটা পুরাটাই আপনার জন্যে। শালারে দুপুর একটার সময় ফোন দেই, কয় এখন মাঝ রাস্তায়। আমি তো জানি শালা আমার ফোনটা রাইখাই আবার উল্টা হইয়া শুইসে আরো আধা ঘন্টা ঘুমাইবো। এদিকে ক্লায়েন্টকে বলে দিসি কাজ অলমোস্ট শেষ।

- সরি মাহমুদ ভাই। 

- এখন সরি বইলা লাভ আসে?  চুল যা যাওয়ার সব তো চৈলাই গেসে।  

যাহোক আমি দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সত্যি বারোটা বাজে। মিম দুই ঘন্টা ওয়েট করে আমার চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে বাসায় ফিরে যাচ্ছে। আর এদিকে আমি যখন উঠেই পড়েছি, তো এখন মাহমুদ ভাইয়ের ফোন আসার আগেই অফিসে যেতে পারলে ভালো হয়। 

সে আমলে বাসাবো থেকে বনানীর অফিসে যেতে মোটামোটি বাস রিক্সা টেম্পো সবগুলো চড়াই উৎরাই পার করেই যেতে হতো। তবে যেটাতে চড়তে আমার সবচে বেশী ভয় লাগতো সেটা হলো আমাদের  সুউচ্চ চোদ্দতলা অফিস বিল্ডিংয়ের লিফ্টটা। কারণ ওটা আমার মতোই নিজের মেজাজ মর্জি অনুযায়ী চলতে পছন্দ করতো। প্রায়ই দেখা যেত দুই ফ্লোরের মাঝামাঝি এসে থেমে সে ফটাস করে দরজা খুলে দিতো। ভাবটা এতদূর যে আসছি এইটাই বেশী। এখন যারা উপরের ফ্লোরে যাবা লাফিয়ে উঠে যাও আর যারা নিচেরটায়, হামাগুড়ি দেয়া শুরু করো। দশ সেকেন্ড সময় দিলাম। তাড়াতাড়ি।  

যাহোক এবারের মতো লিফ্টটা আর তেড়ামি করলো না। আমি লিফ্ট থেকে বেরিয়ে আমার অফিসের গ্লাসের তৈরী গেটের সামনে এসে গ্লাসের ভিতর দিয়েই দেখলাম ওপারে রেসিপশনে বসে আয়শা বেগম আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে। আমার সন্দেহ হলো ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। গেট পেরিয়ে দেখলাম হ্যা যা ভেবেছিলাম তাই। ওয়েটিং লাউঞ্জে দুটি মেয়ে বসে আছে। পরিচয় না করিয়ে দিলেও একজনের চোখ মুখ দিয়ে রাগে যে ধোয়া বের হচ্ছে তা দেখেই বুঝলাম ইনিই মিম। আমাকে ঝাড়তে এসেছে। তাও একা আসেনি। ব্যাকআপ হিসেবে কোনোই ধরে তার পিঠাপিঠি বোনটাকেও সাথে নিয়ে এসেছে।

তখন মনে হচ্ছিলো দু দিন আগে, আরে তোমার বাসাতো দেখি প্রায় আমার অফিসের পাশেই আলাপ করাটা মোটেও উচিৎ হয়নি। যাহোক, আমি ঢোকার সাথে সাথেই মিম তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে কিছু বলতে যাবার আগেই আমি বলা শুরু করে দিলাম - আরে তুমি এই গরমের মধ্যে এইখানে বসে আছো কোনো? চলো ছাদে চলো। ছাদে অনেক বাতাস আছে। পেছন থেকে আয়শা মজা দেখার জন্যে বলে উঠলো  - ভাইয়া এইখানে তো এসি চলছে, এখানেই বসেন না। আমি আয়শার ফাঁদে পা না দিয়ে মিমকে ছাদে নিয়ে যাওয়া শুরু করলাম। আর যাওয়ার আগে আড়চোখে পেছনে দেখলাম আয়শা আর মিমের বোনের বত্রিশ বত্রিশ মোট চৌষট্টিটা দাঁত ঝকমক করছে। কিছু করার নাই। খালি দোআ করছি আয়শা যেনো আর অফিসে না ছড়ায়। তাহলে আগামী কয়েক মাস ডেভেলপারদের প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ পাটি দাঁত আমাকে উঠতে বসতে দেখতে হবে। 

পাঁচ মিনিট পরে মিম আর আমি ছাদে। আসে পাশে বাতাসের কোনো নাম গন্ধও নেই। কড়া রোদ আর মিমের ঝাড়িতে আমি দরদর করে গামছি। আর ভাবছি হারামজাদা সুমন নিশ্চই এখনোও দিব্বি নাক ডেকে গুমোচ্ছে। 

সেদিন রাতে এক ফাঁকে আড্ডা থেকে বেরিয়ে মিমকে ফোন দিয়েছিলাম। ওপাশ থেকে একজন ছেলে মানুষের রুক্ষ কর্কশ গলা শুনতে পেলাম - হ্যালো? 

মিমের বাবা বা বড় ভাই কেও একজন হবে নিশ্চই। আমি তাড়াতাড়ি ওকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই একাধারে ভরভর করে বলে যেতে শুরু করলাম - কে কবির? কি ব্যাপার তোমার? আজকাল কোনো খোঁজ খবরই নাও না যে? আমাকেই ফোন করে সব জেনে নিতে হয়! তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট তো জানালা না। পাশ কোরলা না ফেল কোরলা একটু জানাব না? আমি তো ধরে নিয়েছি ফেল করেছো তাই ফোন দাও নাই। 

ওপাশ থেকে বেশ বিরক্তি নিয়ে বললো - ভাই কাকে চাচ্ছেন?

- কাকে চাচ্ছি মানে? তোমার পরীক্ষার রেজাল্ট বেড় হয়নি দুই দিন আগে? 

- ভাই এটা কবিরের নম্বর না। আপনি রং নম্বরে ডায়াল করেছেন। 

- বলো কি? তুমি কবির না? যাস শালা, পাঁচটা টাকা জলেই গেলো। বলে আমি ফোন রেখে দিলাম। 

পরে মিমের কাছেই শুনেছি আমি যখন ফোন দিয়েছিলাম তখন ওর ফুল ফ্যামেলী টেবিলে এক সাথে রাতের খাবার খেতে বসেছে। ওর বড়ো ভাইই উঠে গিয়ে ফোনটা ধরেছিলো। তারপর ফোন রেখে এসে ফোনের কাহিনী সবাইকে বলেছে। শুনে সবাই হো হো করে হাসছিলো। শুদু মিমের বাবা গম্ভীর গলায় বলেছিলো - ব্যাটা যাকে খুঁজছিলো তাকে না পেয়ে গলার সুর পাল্টিয়েছে। শুনে সবাই নাকি আরো জোরে হো হো হাসছিলো আর মিমের লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করছিলো। 

যাহোক সেসব অনেক অনেক, অনেক আগেকার কাহিনী। তখন ইন্টারনেট ছিল আমাদের জন্যে অষ্টম আশ্চর্য। আর এখনকার অষ্টম আশ্চর্য হলো চ্যাট জিপিটি। যা নিমিনেই বোদ্ধার মতো নুতুন নুতুন কবিতা আর ছড়া গান লিখে দিতে পারে। একটি ঘড়ির আত্মকাহিনী লেখা নাকি এর জন্যে কোনো ব্যাপারই না। সামনের প্রজন্মের জন্যে ভার্চুয়াল কোম্পানিওন হিসেবেও বেশ ভালো কাজ করবে বলে আসা করা যাচ্ছে। কিন্তু রিয়েল রক্ত মাংসের মানুষের জীবনের শাখায় প্রশাখায় যেসব ছোট খাটো গল্প গুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, চ্যাট জিপিটি কি তা কখনো প্রণয়ন করতে পারবে? ঘটনার প্রবাহে পরিস্থিতি যেমন হটাৎ মোচড় ঘুরে মানুষকে সব অপ্রত্যাশিত সুস্বাগদিতো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে, তেমনটা কি আদোও ঘটবে? 

ঘটুক বা না ঘটুক সেটা নেক্সট প্রজন্মই বুঝুক, আমি যে এখনো গাজী প্লাষ্টিক ট্যাংকের মতোই দিব্যি টিকে আছি সেটাই বড় কথা। তবে বয়েসের কারণে বকবকানিটা একটু বেড়ে গেছে আর কি। বাড়ুক, আমি ঠিক করেছি আরসাইমার রোগে ধরার আগেই জীবনের এই ছোটো খাটো স্মৃতি গুলো কাগজে টুকে রাখবো। পরে যেন নিজেই নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারি জীবনটা নেহাত খারাপ কাটেনি। 






Comments